মোঃ মনজুরুল ইসলাম
January 19, 2026 at 8:42 AM
১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাস। শীত তখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। সকালের কুয়াশার ভেতর দিয়ে নতুন এক যাত্রা শুরু হয়েছিল আমার। আমি তখন একেবারেই ছোট—হাতের ব্যাগটা নিজের শরীরের চেয়েও বড় মনে হতো। সেদিনই প্রথম পা রেখেছিলাম গোটিয়ার শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়-এর চৌকাঠে। জানতাম না, এই স্কুলটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির ভাণ্ডার হয়ে উঠবে।
আমাদের ক্লাসে মোট ৭৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। তার মধ্যে ৫০ জন ছেলে, বাকিরা মেয়ে। ক্লাসটা ছিল যেন একটা ছোট সমাজ—হাসি, কান্না, প্রতিযোগিতা, ভয়, বন্ধুত্ব আর স্বপ্নে ঠাসা। কেউ খুব মেধাবী, কেউ গড়পড়তা, কেউ আবার পড়ালেখার নাম শুনলেই পালাতে চায়। তবুও আমরা সবাই ছিলাম এক সুতোয় গাঁথা।
স্কুলের প্রথম দিন থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম—এখানে শুধু বইয়ের পড়া নয়, জীবন শেখানো হবে।
স্যারদের কথা না বললেই নয়
আমাদের স্কুল মানেই ছিল কিছু অসাধারণ শিক্ষক। আজ এত বছর পরেও চোখ বন্ধ করলে তাদের মুখ, কণ্ঠস্বর, এমনকি হাঁটার ভঙ্গিটাও মনে পড়ে।
আলী আকবর স্যার—ইংরেজি পড়াতেন। মানুষটা ছিলেন শান্ত, কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু বোঝানোর ক্ষমতা ছিল দুর্দান্ত। ইংরেজি যে এত সহজ হতে পারে, সেটা আমরা প্রথম বুঝেছিলাম তার ক্লাসে। কঠিন গ্রামারও তিনি গল্পের মতো করে বুঝাতেন। ক্লাসে ঢুকলেই মনে হতো—আজ ভয় নেই।
আবু তাহের স্যার পড়াতেন বাংলা। তার উচ্চারণ এত সুন্দর ছিল যে, কবিতা পড়লে মনে হতো কবিতাই কথা বলছে। তিনি যখন “সোনার তরী” বা “বিদ্রোহী” পড়াতেন, পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে যেত। আমরা শুধু শুনতাম—মুগ্ধ হয়ে।
নুরুল ইসলাম স্যার—গণিত। নাম শুনলেই অনেকের মাথা ঘুরত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, উনি এমনভাবে অংক ভেঙে ভেঙে পড়াতেন যে, ভয়টা কোথায় যেন হারিয়ে যেত। “একবারে বুঝতে না পারলে সমস্যা নেই”—এই কথাটা তিনি প্রায়ই বলতেন। আজ বুঝি, উনি শুধু গণিত না, ধৈর্যও শেখাতেন।
আমজাদ স্যার পড়াতেন ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান। তার ক্লাস মানেই গল্প। মোগল আমল হোক বা ব্রিটিশ শাসন—সবকিছু এমনভাবে বলতেন যেন তিনি নিজেই সেখানে ছিলেন। কখনো হাসাতেন, কখনো ভাবাতেন।
গোলজার স্যার ছিলেন ইংরেজি গ্রামারের গুরু। তার ক্লাসে হাসির অভাব ছিল না। কঠিন নিয়মগুলো তিনি এমন মজা করে বোঝাতেন যে, না শিখে উপায় ছিল না।
আর ছিলেন জাকির স্যার—বাংলা গ্রামার। তিনি একটু কঠোর ছিলেন। না বুঝলে শাস্তি দিতেন, সেটা সত্যি। তখন ভয় লাগত, কিন্তু আজ বুঝি—ওটাই হয়তো তার ভালোবাসার ভাষা ছিল।
ক্লাসরুমের বাইরে
শুধু পড়ালেখা নয়—স্কুল মানে ছিল দুষ্টুমি, মাঠে দৌড়, টিফিন ভাগাভাগি, আর পরীক্ষার আগে টেনশন।
টিফিনের সময়টা ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কেউ লুচি আনত, কেউ মুড়ি, কেউ আবার কিছুই আনত না—তবু সবার ভাগে কিছু না কিছু জুটত। বন্ধুত্ব তখন কোনো শর্ত মানত না।
মাঠে খেলাধুলা—ফুটবল, দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি। অনেক সময় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খেলতাম, আবার ধরা পড়ে বকা খেতাম। তবুও সেই বকুনিও আজ মিষ্টি লাগে।
সেই বিশেষ সাফল্য
৭ম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা। পড়েছিলাম মন দিয়ে। ভয়ও ছিল। ফলাফল যেদিন বের হলো—আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। সেই অনুভূতি ভাষায় বোঝানো কঠিন। স্যারদের চোখে গর্ব, বন্ধুদের মুখে বিস্ময়, আর নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
সেদিন বুঝেছিলাম—পরিশ্রম কখনো হারায় না।
সময় চলে যায়, স্মৃতি থাকে
আজ এত বছর পর, আমি মোঃ মনজুরুল ইসলাম—জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু যখনই অতীতে ফিরি, দেখি সেই স্কুলের বারান্দা, সেই ক্লাসরুম, সেই স্যারদের মুখ।
হাই স্কুল লাইফ আমাকে শিখিয়েছে—
শৃঙ্খলা, বন্ধুত্ব, সম্মান আর স্বপ্ন দেখতে।
সবাই হয়তো জীবনে বড় কিছু হয় না, কিন্তু সবাই জীবনের বড় একটা সময় এই স্কুলে কাটায়। আর সেটাই হয় জীবনের সবচেয়ে খাঁটি অধ্যায়।
গোটিয়ার শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়—তুমি শুধু একটা স্কুল না, তুমি আমার শেকড়।
আমাদের ক্লাসে মোট ৭৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। তার মধ্যে ৫০ জন ছেলে, বাকিরা মেয়ে। ক্লাসটা ছিল যেন একটা ছোট সমাজ—হাসি, কান্না, প্রতিযোগিতা, ভয়, বন্ধুত্ব আর স্বপ্নে ঠাসা। কেউ খুব মেধাবী, কেউ গড়পড়তা, কেউ আবার পড়ালেখার নাম শুনলেই পালাতে চায়। তবুও আমরা সবাই ছিলাম এক সুতোয় গাঁথা।
স্কুলের প্রথম দিন থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম—এখানে শুধু বইয়ের পড়া নয়, জীবন শেখানো হবে।
স্যারদের কথা না বললেই নয়
আমাদের স্কুল মানেই ছিল কিছু অসাধারণ শিক্ষক। আজ এত বছর পরেও চোখ বন্ধ করলে তাদের মুখ, কণ্ঠস্বর, এমনকি হাঁটার ভঙ্গিটাও মনে পড়ে।
আলী আকবর স্যার—ইংরেজি পড়াতেন। মানুষটা ছিলেন শান্ত, কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু বোঝানোর ক্ষমতা ছিল দুর্দান্ত। ইংরেজি যে এত সহজ হতে পারে, সেটা আমরা প্রথম বুঝেছিলাম তার ক্লাসে। কঠিন গ্রামারও তিনি গল্পের মতো করে বুঝাতেন। ক্লাসে ঢুকলেই মনে হতো—আজ ভয় নেই।
আবু তাহের স্যার পড়াতেন বাংলা। তার উচ্চারণ এত সুন্দর ছিল যে, কবিতা পড়লে মনে হতো কবিতাই কথা বলছে। তিনি যখন “সোনার তরী” বা “বিদ্রোহী” পড়াতেন, পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে যেত। আমরা শুধু শুনতাম—মুগ্ধ হয়ে।
নুরুল ইসলাম স্যার—গণিত। নাম শুনলেই অনেকের মাথা ঘুরত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, উনি এমনভাবে অংক ভেঙে ভেঙে পড়াতেন যে, ভয়টা কোথায় যেন হারিয়ে যেত। “একবারে বুঝতে না পারলে সমস্যা নেই”—এই কথাটা তিনি প্রায়ই বলতেন। আজ বুঝি, উনি শুধু গণিত না, ধৈর্যও শেখাতেন।
আমজাদ স্যার পড়াতেন ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান। তার ক্লাস মানেই গল্প। মোগল আমল হোক বা ব্রিটিশ শাসন—সবকিছু এমনভাবে বলতেন যেন তিনি নিজেই সেখানে ছিলেন। কখনো হাসাতেন, কখনো ভাবাতেন।
গোলজার স্যার ছিলেন ইংরেজি গ্রামারের গুরু। তার ক্লাসে হাসির অভাব ছিল না। কঠিন নিয়মগুলো তিনি এমন মজা করে বোঝাতেন যে, না শিখে উপায় ছিল না।
আর ছিলেন জাকির স্যার—বাংলা গ্রামার। তিনি একটু কঠোর ছিলেন। না বুঝলে শাস্তি দিতেন, সেটা সত্যি। তখন ভয় লাগত, কিন্তু আজ বুঝি—ওটাই হয়তো তার ভালোবাসার ভাষা ছিল।
ক্লাসরুমের বাইরে
শুধু পড়ালেখা নয়—স্কুল মানে ছিল দুষ্টুমি, মাঠে দৌড়, টিফিন ভাগাভাগি, আর পরীক্ষার আগে টেনশন।
টিফিনের সময়টা ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কেউ লুচি আনত, কেউ মুড়ি, কেউ আবার কিছুই আনত না—তবু সবার ভাগে কিছু না কিছু জুটত। বন্ধুত্ব তখন কোনো শর্ত মানত না।
মাঠে খেলাধুলা—ফুটবল, দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি। অনেক সময় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খেলতাম, আবার ধরা পড়ে বকা খেতাম। তবুও সেই বকুনিও আজ মিষ্টি লাগে।
সেই বিশেষ সাফল্য
৭ম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা। পড়েছিলাম মন দিয়ে। ভয়ও ছিল। ফলাফল যেদিন বের হলো—আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। সেই অনুভূতি ভাষায় বোঝানো কঠিন। স্যারদের চোখে গর্ব, বন্ধুদের মুখে বিস্ময়, আর নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
সেদিন বুঝেছিলাম—পরিশ্রম কখনো হারায় না।
সময় চলে যায়, স্মৃতি থাকে
আজ এত বছর পর, আমি মোঃ মনজুরুল ইসলাম—জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু যখনই অতীতে ফিরি, দেখি সেই স্কুলের বারান্দা, সেই ক্লাসরুম, সেই স্যারদের মুখ।
হাই স্কুল লাইফ আমাকে শিখিয়েছে—
শৃঙ্খলা, বন্ধুত্ব, সম্মান আর স্বপ্ন দেখতে।
সবাই হয়তো জীবনে বড় কিছু হয় না, কিন্তু সবাই জীবনের বড় একটা সময় এই স্কুলে কাটায়। আর সেটাই হয় জীবনের সবচেয়ে খাঁটি অধ্যায়।
গোটিয়ার শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়—তুমি শুধু একটা স্কুল না, তুমি আমার শেকড়।
অনুমোদিত