অলি আহমেদ
January 17, 2026 at 4:43 AM
শীতের কুয়াশা ভেদ করে সেদিন সকালের সূর্য প্রতিদিনকার মতনই পুবাকাশ লাল করে উঠেছিল। মেঠোপথের দু'ধারে ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দুগুলো মুক্তদানার মত চকচক করছিল। দিগন্ত বিস্তৃত আবাদি জমিতে সরিষার হলুদ ফুলের উপর শিশির জমে ফুলগুলো কিছুটা নুয়ে পড়েছিল। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছিল। সরিষা ক্ষেতের পাশে কৃষকেরা বসেছিল জমির আলের উপর! নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল। হয়তো আগামী দিনের স্বচ্ছন্দের গল্প!
এমন একটি সকাল আমার জন্য যে সুখের বাতাবরণ তৈরি করবে না আমার ছোট্ট কিশোর মন কোনভাবেই বুঝতে পারেনি। হাড়িভাংগা প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গোটিয়া শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেদিন ছিল মার্চ মাসের কোন এক শনিবার। গত সপ্তাহের বুধবারে ভর্তি হই। প্রাইমারি স্কুলের সকল বন্ধু এবং গোটিয়া গ্রামে আমার নানা বাড়ি থাকায় অনেকের সাথে পরিচয় ছিল যাদের সবাইকে সবাইকে একই স্কুলে পাই। ভর্তি হওয়ার পরদিন বৃহস্পতিবার থাকায় ঐদিন স্কুলে যাইনি। একদিন ছুটি কাটিয়ে শনিবার থেকে ক্লাস করার মনস্থির করি।
শনিবার সকালে কোন বইখাতা ছাড়াই স্কুলে যাই। স্কুলের বুকলিষ্ট ক্লাস রুটিন কোনকিছুই আমার জানা নয়। হাতে একটি পুরোনো খাতা এবং কলম নিয়ে স্কুলে যাই প্রথম দিনের ক্লাসে। পুর্বমুখী লম্বা টিনের ঘর। মেয়েদের কমন রুমের পাশেই ক্লাস সিক্সের 'ক' শাখার ক্লাস রুম। ক্লাস রুমে ঢোকার পর পুর্বমুখী করে চারটি ব্রেঞ্চ ছিল। এগুলো ছিল মেয়েদের বসার জায়গা। উত্তরমুখী করে দু'সারিতে আটটি ব্রেঞ্চ ছেলেদের জন্য। আমি পশ্চিম পাশের সারিতে তৃতীয় নাম্বার ব্রেঞ্চে বসার জায়গা পাই। ক্লাসে মোটামুটি ছেলেমেয়ে মিলে জনা পচিশেক ছাত্র ছাত্রী।
ততদিনে ক্লাস রুটিন বুকলিষ্ট দেয়া হয়ে গেছে। সকলেই বইপত্র সব কিনেছে৷ পুরোদমে ক্লাস চলছে। ক্লাস সিক্সের 'ক' শাখার প্রথম পিরিয়ড ছিল অংক। অংক স্যার ছিলেন শামছুল আলম স্যার। স্যারের একটা ডাকনাম ছিল সকলের কাছে যেটা আমি পরে জেনেছি। নয়দালি। স্যার আমাকে মাফ করে দেবেন। আপনাকে কেন এই নামে ডাকা হতো আজো আমি জানিনা। তবে এই নামে ডাকার মধ্যে কোন অসম্মান কখনো কারো মধ্যে দেখিনি।
হাই স্কুল জীবমের প্রথম ক্লাস। দারুন রোমাঞ্চকর এক মুহুর্ত। আগামীর স্বপ্ন বুনার প্রথম সিড়িতে পা দেয়া। বিশ্বভ্রমাণ্ড চিনার মহা সড়কে পদার্পণ! নতুন বন্ধু। নতুন আবহ আর নতুন এক জগৎ। যে জগৎ আমার চেনা নয়! ক্লাসের সকলের চাইতে খর্বকায় এবং বয়সে কম থাকায় লাইমলাইটে আসা আমার জন্য ছিল অতি কঠিন। আমি জানতাম ঐ জায়টা আমার!
শামসুল আলম স্যার আসলেন। অংক ক্লাস। সপ্তাহে ছয়দিন ক্লাস। শনিবার রবিবার জ্যামিতি, সোমবার মঙ্গলবার পাটিগনিত আর বুধবার বৃহস্পতিবার বীজগণিত। স্বাভাবিক ভাবে সকলেই জ্যামিতি বক্স এনেছে কিনা চেক করা হচ্ছে। যারা জ্যামিতি বক্স আনেনি তাদের সকলকে দাড় করানো হলো। আমিও দাড়ালাম। যারা পুরনো আর জ্যামিতি বক্স আনেনি তাদের প্রত্যেকের কৈফিয়ত শুনলেন এবং তিনটা করে বেতের বাড়ি মারলেন। কেউ হাতের তালুতে আবার কেউ বাহুতে স্যারের হাতের মেহমানদারি (বাশ দিয়ে তৈরি করা বেতের বাড়ি) খেলেন। সকলেই বসে পড়লো। আমি ক্লাসে নতুন। নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। বইখাতা কেন আনিনি জানতে চাইলেন। জ্যামিতি বক্স কেন আনা হয় নাই জিজ্ঞেস করলেন। আমি জবাবে বললাম স্যার আমি নতুন ভর্তি হইছি এখনো ক্লাস রুটিন এবং বুকলিষ্ট কিছুই জানি না। ক্লাসের অনেকেই ছিল আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু। স্যার আমাকে বললেন হাত পাতো! আমি বিষ্ময়ে বললাম জি স্যার! ক্লাসের সকলেই অনুরোধ করলেন স্যার ও তো নতুন ওরে বাড়ি মাইরেন না স্যার। স্যার একটু থেমে গেলেন। ক্লাসের সকলের একই কথা স্যার ও নতুন।
শামসুল আলম স্যার আকাশ ভেঙ্গে পড়া একটি কথা বললেন। স্যার বললেন কবে ভর্তি হইছো? আমি বললাম গত বুধবার। স্যার বললেন ভর্তি হইছো মানে পুরান! এই বলে হাত পাততে বললেন। আমি হাত সামনে বাড়িয়ে দিলাম। স্যার গুনে গুনে তিনটি বাড়ি আমার ছোট্ট হাতের তালুতে মারলেন। হাতের তালু লাল হয়ে গেল। চোখের কোনায় জল জমে গেল। এত বাড়ি আমি এর আগে কোনদিন খাইনি। প্রাইমারি স্কুলে একদিন হেড স্যারের মার খেয়েছিলাম সেটা অন্য কারণে।
এটিই ছিল আমার গোটিয়া শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম দিনের স্মৃতি। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই দিনের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। শামসুল আলম স্যার আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন পরবর্তীতে। ক্লাসের ভালো ছাত্র হিসাবে ততদিনে কিছুটা নামধাম হয়েছে।
ভালো থাকবেন স্যার। আপনাদের আদর মাখানো চরম শাসন ছিল বলেই আমরা আজ জীবনে এতটুকু আসতে পেরেছি সেই বিশ্বাস করি। ভালো থাকুক প্রিয় স্যারেরা। ভালো থাকুক সকল শিক্ষরেরা।
এমন একটি সকাল আমার জন্য যে সুখের বাতাবরণ তৈরি করবে না আমার ছোট্ট কিশোর মন কোনভাবেই বুঝতে পারেনি। হাড়িভাংগা প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গোটিয়া শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেদিন ছিল মার্চ মাসের কোন এক শনিবার। গত সপ্তাহের বুধবারে ভর্তি হই। প্রাইমারি স্কুলের সকল বন্ধু এবং গোটিয়া গ্রামে আমার নানা বাড়ি থাকায় অনেকের সাথে পরিচয় ছিল যাদের সবাইকে সবাইকে একই স্কুলে পাই। ভর্তি হওয়ার পরদিন বৃহস্পতিবার থাকায় ঐদিন স্কুলে যাইনি। একদিন ছুটি কাটিয়ে শনিবার থেকে ক্লাস করার মনস্থির করি।
শনিবার সকালে কোন বইখাতা ছাড়াই স্কুলে যাই। স্কুলের বুকলিষ্ট ক্লাস রুটিন কোনকিছুই আমার জানা নয়। হাতে একটি পুরোনো খাতা এবং কলম নিয়ে স্কুলে যাই প্রথম দিনের ক্লাসে। পুর্বমুখী লম্বা টিনের ঘর। মেয়েদের কমন রুমের পাশেই ক্লাস সিক্সের 'ক' শাখার ক্লাস রুম। ক্লাস রুমে ঢোকার পর পুর্বমুখী করে চারটি ব্রেঞ্চ ছিল। এগুলো ছিল মেয়েদের বসার জায়গা। উত্তরমুখী করে দু'সারিতে আটটি ব্রেঞ্চ ছেলেদের জন্য। আমি পশ্চিম পাশের সারিতে তৃতীয় নাম্বার ব্রেঞ্চে বসার জায়গা পাই। ক্লাসে মোটামুটি ছেলেমেয়ে মিলে জনা পচিশেক ছাত্র ছাত্রী।
ততদিনে ক্লাস রুটিন বুকলিষ্ট দেয়া হয়ে গেছে। সকলেই বইপত্র সব কিনেছে৷ পুরোদমে ক্লাস চলছে। ক্লাস সিক্সের 'ক' শাখার প্রথম পিরিয়ড ছিল অংক। অংক স্যার ছিলেন শামছুল আলম স্যার। স্যারের একটা ডাকনাম ছিল সকলের কাছে যেটা আমি পরে জেনেছি। নয়দালি। স্যার আমাকে মাফ করে দেবেন। আপনাকে কেন এই নামে ডাকা হতো আজো আমি জানিনা। তবে এই নামে ডাকার মধ্যে কোন অসম্মান কখনো কারো মধ্যে দেখিনি।
হাই স্কুল জীবমের প্রথম ক্লাস। দারুন রোমাঞ্চকর এক মুহুর্ত। আগামীর স্বপ্ন বুনার প্রথম সিড়িতে পা দেয়া। বিশ্বভ্রমাণ্ড চিনার মহা সড়কে পদার্পণ! নতুন বন্ধু। নতুন আবহ আর নতুন এক জগৎ। যে জগৎ আমার চেনা নয়! ক্লাসের সকলের চাইতে খর্বকায় এবং বয়সে কম থাকায় লাইমলাইটে আসা আমার জন্য ছিল অতি কঠিন। আমি জানতাম ঐ জায়টা আমার!
শামসুল আলম স্যার আসলেন। অংক ক্লাস। সপ্তাহে ছয়দিন ক্লাস। শনিবার রবিবার জ্যামিতি, সোমবার মঙ্গলবার পাটিগনিত আর বুধবার বৃহস্পতিবার বীজগণিত। স্বাভাবিক ভাবে সকলেই জ্যামিতি বক্স এনেছে কিনা চেক করা হচ্ছে। যারা জ্যামিতি বক্স আনেনি তাদের সকলকে দাড় করানো হলো। আমিও দাড়ালাম। যারা পুরনো আর জ্যামিতি বক্স আনেনি তাদের প্রত্যেকের কৈফিয়ত শুনলেন এবং তিনটা করে বেতের বাড়ি মারলেন। কেউ হাতের তালুতে আবার কেউ বাহুতে স্যারের হাতের মেহমানদারি (বাশ দিয়ে তৈরি করা বেতের বাড়ি) খেলেন। সকলেই বসে পড়লো। আমি ক্লাসে নতুন। নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। বইখাতা কেন আনিনি জানতে চাইলেন। জ্যামিতি বক্স কেন আনা হয় নাই জিজ্ঞেস করলেন। আমি জবাবে বললাম স্যার আমি নতুন ভর্তি হইছি এখনো ক্লাস রুটিন এবং বুকলিষ্ট কিছুই জানি না। ক্লাসের অনেকেই ছিল আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু। স্যার আমাকে বললেন হাত পাতো! আমি বিষ্ময়ে বললাম জি স্যার! ক্লাসের সকলেই অনুরোধ করলেন স্যার ও তো নতুন ওরে বাড়ি মাইরেন না স্যার। স্যার একটু থেমে গেলেন। ক্লাসের সকলের একই কথা স্যার ও নতুন।
শামসুল আলম স্যার আকাশ ভেঙ্গে পড়া একটি কথা বললেন। স্যার বললেন কবে ভর্তি হইছো? আমি বললাম গত বুধবার। স্যার বললেন ভর্তি হইছো মানে পুরান! এই বলে হাত পাততে বললেন। আমি হাত সামনে বাড়িয়ে দিলাম। স্যার গুনে গুনে তিনটি বাড়ি আমার ছোট্ট হাতের তালুতে মারলেন। হাতের তালু লাল হয়ে গেল। চোখের কোনায় জল জমে গেল। এত বাড়ি আমি এর আগে কোনদিন খাইনি। প্রাইমারি স্কুলে একদিন হেড স্যারের মার খেয়েছিলাম সেটা অন্য কারণে।
এটিই ছিল আমার গোটিয়া শোমসের আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম দিনের স্মৃতি। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই দিনের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। শামসুল আলম স্যার আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন পরবর্তীতে। ক্লাসের ভালো ছাত্র হিসাবে ততদিনে কিছুটা নামধাম হয়েছে।
ভালো থাকবেন স্যার। আপনাদের আদর মাখানো চরম শাসন ছিল বলেই আমরা আজ জীবনে এতটুকু আসতে পেরেছি সেই বিশ্বাস করি। ভালো থাকুক প্রিয় স্যারেরা। ভালো থাকুক সকল শিক্ষরেরা।
অনুমোদিত